জীবনধারা

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজ ১২৬তম জন্মবার্ষিকী

ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নেতাজির লড়াই আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান বিপ্লবী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজ ১২৬তম জন্মবার্ষিকী। তিনি ছিলেন ভারতের সেই মহান স্বতন্ত্র সেনানীদের একজন, যিনি আজও যুব সমাজের অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। ১৮৯৭ সালের ২৩শে জানুয়ারি ওড়িশার কটকে জন্মগ্রহণ গ্রহণ করেন সুভাষচন্দ্র বসু। তাঁর বাবা ছিলেন জানকীনাথ বসু এবং প্রভাবতী দেবী। জানকীনাথ বসু কটক শহরে প্রসিদ্ধ একজন আইনজীবী ছিলেন। প্রভাবতী দেবী ছিলেন একজন বাঙালি সাহিত্যিক, গীতিকার ও শিক্ষাব্রতী। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক। তিনি নারী গোয়েন্দা চরিত্র কৃষ্ণা-র নির্মাতা। সুভাষচন্দ্র তাঁদের নবম সন্তান ও পঞ্চম ছেলে ছিলেন। ছোটবেলা থেকে খেলাধূলা ও উদ্যানচর্চার বিষয়েও উৎসাহ দেওয়া হত সুভাষচন্দ্রকে। স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ তাঁকে ছোট থেকেই অনুপ্রাণিত করে। তিনি প্রাথমিক পড়াশোনা কটকের র‌্যাভেনশা কলেজিয়েট স্কুল থেকে করেন। এরপর তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে পড়াশোনা করেন। এরপর সিভিল সার্ভিসের জন্য প্রস্তুতি নিতে তাঁর মা-বাবা তাঁকে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান। ১৯২০ সালে তিনি ইংল্যান্ডে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পাস করেন কিন্তু ভারতীয় স্বতন্ত্রতা সংঘর্ষে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। সিভিল সার্ভিস ছেড়ে দেওয়ার পরে দেশকে ইংরেজদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য ভারতীয় রাষ্ট্রীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। জালিয়ানওয়ালা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নেতাজিকে অত্যন্ত বিচলিত মর্মাহত করে।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৭ সালে নিজের সেক্রেটারি ও অস্ট্রেলিয়ার যুবতী এমিলির সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এঁদের দু’‌জনের মেয়ে অনিতা বর্তমানে নিজের পরিবারের সঙ্গে জার্মানিতে থাকেন।

দেশের জন্য আজীবন লড়াই:

তরুণ বয়স থেকেই দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করার জন্য লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন সুভাষচন্দ্র বসু। স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়ে প্রথমে যোগ দেন কংগ্রেসে। দীর্ঘ ২০ বছর কংগ্রেসের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন সুভাষচন্দ্র বসু। প্রথম সক্ষাতেই মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর মতানৈক্য উঠে আসে, তবুও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের দেখানো পথে হেঁটে যোগ দেন জাতীয় রাজনীতিতে। একটা সময় কংগ্রেসের সভাপতিও হন। যদিও পরে মতপার্থক্যের কারণে কংগ্রেস ছাড়েন সুভাষচন্দ্র। গড়ে তোলেন ফরওয়ার্ড ব্লক দল। দেশকে স্বাধীন করার জন্য দীর্ঘদিন দেশের বাইরে কাটিয়েছেন নেতাজি। ঘুরেছেন জার্মানি-জাপানের মতো দেশে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে তোলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। এছাড়াও আজাদ হিন্দ ফৌজের একটি পৃথক মহিলা ইউনিটও ছিল। যার নাম দেওয়া হয় ঝাঁসি রানী রেজিমেন্ট। ১৯৪৪ সালের ৪ঠা জুলাই, বার্মায় ভারতীয়দের এক সমাবেশে আজাদ হিন্দ ফৌজের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ প্রদানের সময় নিজের সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তিটি শোনা যায় তাঁর মুখে। নেতাজি বলেন, “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো”।

১৯২১ সাল থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত নেতাজি দেশের স্বাধীনতার জন্য বহুবার জেলে গিয়েছেন। তিনি মানতেন যে, অহিংসার জোরে স্বাধীনতা কখনও আসবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন, নাৎসি জার্মানি, জাপানের মতো দেশে ভ্রমণ করেন এবং ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সহযোগিতা চান।

নেতাজির মৃত্যু রহস্য:

১৯৪৫ সালের ১৮ই অগাস্ট তাইপেইতে একটি বিমান দুর্ঘটনার পর নেতাজি নিখোঁজ হয়ে যান। এরপর থেকেই নেতাজির মৃত্যু ও নিখোঁজ নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হতে থাকে। এই ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিশন বসেছিল, যার মধ্যে দুটি তদন্ত কমিশন দাবি করেছিল যে দুর্ঘটনার পর নেতাজি মারা গিয়েছিলেন। বিচারপতি এম কে মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃতীয় তদন্ত কমিশন দাবি করেছিল যে, ঘটনার পর নেতাজি জীবিত ছিলেন। নেতাজির এই মৃত্যু বিরোধ বসু পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও বিভাজন এনেছিল।

পরাক্রম দিবস:

দেশকে আজীবন স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখেছিলেন সাহসী বঙ্গসন্তান সুভাষচন্দ্র। ব্রিটিশের শাসনমুক্ত ভারত ছিল যাঁর একমাত্র ধ্যান জ্ঞান চিন্তা। ২০২১ সালে নেতাজির জন্মদিনটিকে বিশেষ নাম দেওয়া হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে। গত দুই বছরের মতো এই বছরেও কেন্দ্রের তরফে এই দিনটি পালিত হচ্ছে এই নামেই। ২০২১ সালে কলকাতার ভিক্টোরিয়ায় দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। জল্পনা উঠেছিল তার আগে থেকেই। তবে ২৩শে জানুয়ারি কলকাতার অনুষ্ঠানটির আগের রাতে প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদীর টুইটার প্রোফাইল থেকে একটি পোস্ট করা হয়। সেখানেই উল্লিখিত হয়েছিল পরাক্রম দিবসের কথা। ওই বছরের গোড়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ্য থেকে জারি করা বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি সম্মান জানাতে ও দেশের প্রতি তাঁর আত্মবলিদানকে শ্রদ্ধা জানাতে ভারত সরকার ২৩শে জানুয়ারি দিনটিকে পরাক্রম দিবস হিসাবে ঘোষণা করল’।

এই দিন ঘোষণার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের পক্ষ থেকে নির্দেশ জারি করে এও বলা হয়েছে, ‘নেতাজির জন্মদিন বিশেষ ভাবে পালন করার উদ্দেশ্য হল দেশের সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করা। বিশেষ করে দেশের যুব সমাজকে আরও দেশ ও সমাজমুখী করে তোলা ও দেশের প্রতি প্রেম জানানো’। আরও জানানো হয় যে, এবার থেকে প্রতি বছর ওই দিনটি পরাক্রম দিবস হিসাবে পালিত হবে। ২০২১ থেকেই চলে আসছে এই বিশেষ নাম। তবে দেশনায়ক দিবস না হয়ে পরাক্রম দিবস কেন হল সেই নিয়েই উঠেছিল রাজনৈতিক তরজা।

নেতাজির আজ ১২৬তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ্য থেকে, আন্দামান ও নিকোবরের একুশটি অনামী দ্বীপের নাম রাখা হচ্ছে বীর সেনাদের নামে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পরমবীর চক্র পুরষ্কারপ্রাপ্ত ২১জন সেনার নামে ওই দ্বীপগুলির নামকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।

Sanjana Chakraborty

My name is Sanjana Chakraborty. I'm a content writer. Writing is my passion. I studied literature, so I love writing.

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button